একজন মহীয়সী দেশমাতার চিরবিদায়

সাধারণ রাজপথের সূর্য সৈনিক— একজন মহীয়সী নারীর গৃহিণী থেকে আকর্ষণ নেত্রী, আপোষীর নেত্রী থেকে জনগণের নেত্রী, জনগণের নেত্রী থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক; এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক থেকে আপামর জনতার দেশমাতা— রূপে প্রতিটি মানুষের হৃদয় জয় করে সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের মাতা বা দেশমাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

শুরুতেই একজন অত্যন্ত সৎ সেনা অফিসারের স্ত্রী হয়ে ১৯৭১ সালে প্রথম কারাবরণের মাধ্যমে তার জীবনে কষ্টের সূচনা হয়। তারপর একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান সরকার প্রধানের স্ত্রী থেকে একজন “মা, তুমি মা” হয়ে— একজন সফল গৃহবধূ। অতঃপর তার স্বামীকে হত্যার মাধ্যমে দুঃখের অতল সাগরে পতিত হয়েও দেশ ও জাতির প্রশ্নে দলের নেতাকর্মীদের চোখের পানির দিকে তাকিয়ে সেই শোক, সেই অশ্রুকে শক্তিতে পরিণত করেন।

এ দেশের প্রতিটি খেটে খাওয়া মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশের লুণ্ঠিত গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার শপথ নেন। ইস্পাত-কঠিন মনোবল নিয়ে লোভ-লালসা ও আতাতকে লাথি মেরে এই বাংলাদেশের রাজপথে নিজেকে সাহসী যোদ্ধা হিসেবে দাঁড় করান। স্বৈরাচারের শত নির্যাতন ও শ্লোগানকে লাথি মেরে উত্তপ্ত কালো রাজপথকে আলিঙ্গন করে জনগণের দাবির প্রতি অবিচল থেকে সারা বিশ্বে নিজেকে আপোষহীন দেশনেত্রী হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।

তারপর তার প্রজ্ঞা ও সাহসিকতায় গণতন্ত্রের পক্ষে ইস্পাত-কঠিন মনোবল ও উত্তপ্ত কালো রাজপথের রক্ত দিয়ে লড়াই করে— লোহার শিকলে আবদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করেন। সেই পবিত্র সংবিধানকে তার প্রকৃত মালিক জনগণের হাতে তুলে দিয়ে আবার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এক ধাপ এগিয়ে— নিজেকে একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে একজন সফল, সৎ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে স্থান করে নেন।

দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তার স্বামীর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার জন্য দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে নয়— সারা বিশ্বে নিজেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত লাভ করান।

অতঃপর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি, দেশবিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্রের ফলে আবার রাজপথে নেমে পুনরায় দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সফল হন। এছাড়াও আরেকবার বৃহত্তর অদৃশ্য বিদেশী ষড়যন্ত্রের আঘাত তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। তার ও তার দলকে বাংলার মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং এইবার তাকে তার মাতৃভূমিকেই তৃতীয়বারের মতো কারা-অন্তরীণ করা হয়। কারণ দেশি ও বিদেশী ষড়যন্ত্রে তিনিও, তার দল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

একটি প্রবল টর্নেডোর মতো ষড়যন্ত্র আসে— বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির উৎস, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার উপর। ষড়যন্ত্র আবারো প্রবল হয়— তাকে রাজনীতির মাঠ শুধু নয়, তাকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের জাল বোনা শুরু করে অসংবিধানিক ও দেশের স্বার্থবিরোধী বিদেশী শক্তি। এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ হিসেবে তার পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য একের পর এক আঘাত হানতে থাকে।

এইবার কিছুটা সফল হয়, কিন্তু তার ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা ও মনোবলের কারণে এবারও ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়— তবে পুরোপুরি নয়। এই অপশক্তি আবারও আরেকটি অপশক্তির হাতে জাতিকে তুলে দেয়। শুরু হয় নির্যাতনের নতুন এক অধ্যায়।

প্রথমেই দেশকে পঙ্গু করার জন্য দেশপ্রেমিক শক্তির উপর প্রথম আঘাত হানে। বিদেশী ষড়যন্ত্রের এবার পুরোপুরি সফল হয়— সেই অপশক্তি একটি পরিকল্পিত হামলা করে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সৈনিকদের উপর। হত্যা, হত্যা, হত্যা— কোনঠাসা হয়ে পড়ে জাতীয়তাবাদী শক্তি। শুধু মিটমিট করে জ্বলতে থাকে জাতীয়তাবাদের শেষ আশ্রয়স্থল ও আশার বাতিঘর— আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। শুরু হয় হত্যা, খুন, গুমের ইতিহাস।

বাংলার পূর্ব আকাশে স্বাধীনতার সূর্যকে এই অপশক্তি পশ্চিম আকাশে ঠেলে দেয় ও অস্তমিত করে ফেলে সেই স্বাধীন সূর্যকে। শুরু হয় নতুন একটি অপশক্তির— জন্ম হলো, জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নব্য স্বৈরাচারের। ক্রমে জাতীয়তাবাদী শক্তি একটু একটু করে মাথা ছাড়া দেওয়ার চেষ্টা করার সাথে সাথে আবার শুরু হয় দমন-পীড়ন, হত্যা, গুম, খুনের আরেক ইতিহাস। সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ পরিণত হয় একটি তলাবিহীন ঝুড়িতে; জন্ম নেয় সন্ত্রাসবাদ— তাও আবার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। লক্ষ্য একটাই— সেই আপোষহীন দেশনেত্রী ও তার দলকে ধ্বংস করা।

নতুন করে শুরু হলো দেশের লুটপাটের মহোৎসব। এবার আর তো সহ্য করা যায় না; সাধারণ মানুষের বিশ্বাসও উঠে গেছে। কিন্তু বিরোধিতা করা যাবে না— করলেই মৃত্যু; হয়তো রাষ্ট্রযন্ত্র আজীবনের জন্য আপনার অস্তিত্বকে মিটিয়ে দিবে।

রাষ্ট্রীয় জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবার রাজপথে আওয়াজ তোলেন প্রাণপ্রিয় নেত্রী— পরিণাম আবার চতুর্থবারের মতো কারাবাস। কিন্তু এবারকার কষ্ট এতটা হবে তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি। বিনা চিকিৎসায়, আরও অনেক ভাবে তাকে শেষ করে দেওয়ার ফন্দি আঁটে স্বৈরাচার। বিনা চিকিৎসায়, অসহযোগিতায় উনার একটি হাত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। আর আমাদের আবেগ— তার বড় সন্তান নির্যাতনে বিদেশে নির্বাসিত; আর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো তো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

শুধুমাত্র দেশপ্রেমের জন্য একটি পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে দেশনেত্রীর কাছে একের পর এক প্রস্তাব পাঠায়। আর পাশাপাশি এই বাংলার সাধারণ মানুষ যারা দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আওয়াজ তুললে— দেশের সরকার তার বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করে তাদের উপর দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবুও জনতা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে গেলে তাদের নিখোঁজ করা হয়েছে আজীবনের জন্য।

হত্যা, রক্ত, লাশ, মামলা, কারাগার— সবকিছু দিয়ে যখন জনগণকে থামাতে ব্যর্থ হল, তখন “দেশনত্রীকে ছেড়ে দিবে” এই বলে তার কাছে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে চাপ দিতে থাকে; এবং বন্ধ করে দেয়া হয় সকল প্রকার চিকিৎসা-সেবা। কিন্তু তবুও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এত নির্যাতন, এত লাশ, এত গুম— এত কিছুর পরেও সকল শয়তানি বুদ্ধি ব্যর্থ করে দিয়ে— অন্যায়কে পদদলিত করে, মৃত্যুকে উপেক্ষা করে— তার আপোষহীন বিরোধিতা, অদম্য মনোবলকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে কোন আপোস করেননি তিনি। এবং অদম্য সাহসের কারণে সারা বিশ্বে আবারো তিনি নিজেকে গণতন্ত্রের মুক্তিকামী নেত্রী হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।

এবং এই ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের রাস্তা ও পটভূমি ধরেই স্বৈরাচার থেকে জন্ম নিলো নব্য ফ্যাসিবাদী শক্তি। সাধারণ মানুষকে অত্যাচার-অন্যায় করার জন্য এই নব্য ফ্যাসিবাদী অপশক্তি জনরোষে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হল। বাংলাদেশে আবারো গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ের আলোর ছটায় এই ফ্যাসিবাদের বিনাশ রচনা হল। কিন্তু থেকে গেল লক্ষ্য, মায়ের বুকের আহাজারি— রয়ে গেল ক্ষত।

আর সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে “মা”-এর জায়গা করে নিলেন। এই বাংলাদেশের কোটি কোটি গণতন্ত্রকামী মানুষ তাকে গণতন্ত্রের মাতা শুধু নয়— সমস্ত দেশের মাতা, দেশমাতা হিসেবে মেনে নিয়ে বিশ্বের বুকে এক অনন্য ইতিহাস জন্ম দিল। যা গৌরবের, যা আমাদের আশার আলো দেখায়, বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়; এবং সারা বিশ্বে নিপীড়িতদের আইকন হিসেবে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা জোগাবে। যা সাহসের বাতিঘর— স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম; লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে এই নাম লেখা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

কিন্তু বাংলার পূর্ব আকাশে অন্ধকার মেঘের মতো আসছে বিশাল বিপদ ও কষ্ট— যে মানুষটা এই বিষের সূচনা লগ্ন থেকে কষ্ট করতে করতে আজ নতুনভাবে স্বাধীন হওয়ার পর মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ও দীর্ঘদিন বিনা চিকিৎসায় অন্যায়ভাবে জেলে আটক রাখার কারণে মুক্ত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষটার স্থান হয় আইসিইউতে। আর ফিরে আসা হলো না সহযোদ্ধাদের মাঝে। একসময়ের হার না মানা মানুষটা আজ হেরে গেলেন নিজের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।

আজ আমরা হারালাম একটি রাজপথের সাহসী যোদ্ধা, হাজারো মুক্তিকামী মানুষের সাহসের বাতিঘর— আমার মা, আমাদের মা, সারাদেশের মা, বাংলাদেশের মা— দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়াকে।

এই মহীয়সী, সাহসী, আদর্শবাদী, দৃঢ়চেতা, আপোষহীন দেশমাতা হয়তো চিরবিদায় নিলেন; কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন হাজারো মানুষের হৃদয়ে, সাহসের বাতিঘর হয়ে থাকবেন লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষের অন্তরে। কিন্তু এটি থেমে যাওয়া নয়— এই পরাজয়, মৃত্যুর সাথে— যা বাস্তবেই একটি নতুন পথে যাত্রা, শুভ সূচনা। একজন দেশমাতার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, একটি যুগের সমাপ্তি নয়— এটি একটি যাত্রার শুভ সূচনা মাত্র; যা হবে অসীমের পথে, অনন্তের পথে— যার কোন শেষ নাই, শেষ নাই, শেষ নাই।

এ দেশমাতা, তুমি অমর হয়ে থাকবে এই বিশ্বে কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে, বাংলাদেশের হৃদয়ে_______

আল্লাহ, তুমি আমাদের মা-কে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করো।

Khaled Zia

I’m Mir Tarek A BNP Youth Leader from Rajshahi, Bangladesh

Political Leader

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সেচ্ছাসেবক দল রাজশাহী মহানগর শাখার সাবেক সিনিয়র যুগ্ন-সম্পাদক এবং বর্তমানে একই সংগঠনের আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি।

Category

Political

2 Comments

  • Jewel Rana

    একজন মহীয়সী দেশমাতার চিরবিদায়… আপনার সংগ্রাম, সাহস আর দেশপ্রেম যুগ যুগ ধরে আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন—আমিন।

    • Mir tarek

      আমিন

Leave a Reply to Mir tarek Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Similar Blogs

আপনার পাশে থাকার জন্য প্রস্তুত

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সেচ্ছাসেবক দল রাজশাহী মহানগর শাখার সাবেক সিনিয়র যুগ্ন-সম্পাদক এবং বর্তমানে একই সংগঠনের আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি।